কলম্বোতে ব্রুক ঝড়, সিরিজ জিতল ইংল্যান্ড

কলম্বোতে ব্রুক ঝড়, সিরিজ জিতল ইংল্যান্ড

কলম্বোর বাইশ গজে আজ এক অন্যরকম ঝড়ের সাক্ষী হলো ক্রিকেট বিশ্ব। প্রকৃতির ঝড় নয়, এই ঝড়ের নাম হ্যারি ব্রুক। ইংল্যান্ড বনাম শ্রীলঙ্কা সিরিজের তৃতীয় ও নির্ণায়ক ওয়ানডে ম্যাচে ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক যা করে দেখালেন, তা দীর্ঘদিন ক্রিকেট প্রেমীদের মনে থাকবে। তাঁর অতিমানবীয় ব্যাটিং পারফরম্যান্সে ভর করে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সিরিজ নিজেদের করে নিল সফরকারী ইংল্যান্ড। ৬৬ বলে অপরাজিত ১৩৬ রানের এক অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে ম্যাচের মোড় একাই ঘুরিয়ে দেন ব্রুক। এই জয়ে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২–১ ব্যবধানে জিতে নিল ইংল্যান্ড। ২০২৩ সালের পর এই প্রথম দেশের বাইরে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল ইংলিশরা।

আজকের ম্যাচে সবার নজর কেড়েছে হ্যারি ব্রুকের বিধ্বংসী রূপ। ম্যাচের একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড হয়তো সাধারণ একটি স্কোরের দিকেই এগোচ্ছে, কিন্তু ব্রুকের ব্যাট সবকিছু বদলে দেয়। বিশেষ করে ইনিংসের শেষ দিকে তাঁর রুদ্রমূর্তি শ্রীলঙ্কার বোলারদের লাইন-লেন্থ সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দেয়। অপরপ্রান্তে অভিজ্ঞ জো রুট তাঁর ক্যারিয়ারের ২০তম সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেও, দিনের শেষে সকল আলোচনা বা সব লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছেন তরুণ হ্যারি ব্রুক। চলুন আজকের এই ঐতিহাসিক ম্যাচের খুঁটিনাটি এবং হ্যারি ব্রুকের রেকর্ড গড়া ইনিংস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

আরও জানুনঃ বাঁচা-মরার লড়াইয়ে বাংলাদেশের পুঁজি মাত্র ১৩৬

হ্যারি ব্রুকের অতিমানবীয় ইনিংস ও শেষের ঝড়

হ্যারি ব্রুক যখন ক্রিজে আসেন, তখন ইংল্যান্ডের ইনিংসের ৩২তম ওভার চলছে। শুরুর দিকে তিনি কিছুটা সময় নিয়েছিলেন সেট হওয়ার জন্য। ৪০ ওভার শেষে তাঁর রান ছিল মাত্র ৩৫। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে যা খুব একটা আহামরি কিছু নয়। কিন্তু এরপর যা ঘটলো, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। ৪০ বলে নিজের প্রথম ফিফটি পূরণ করার পর ব্রুক যেন অন্য এক গ্রহে চলে গেলেন। তাঁর দ্বিতীয় ফিফটি বা ১০০ রানে পৌঁছাতে সময় লাগল মাত্র ১৭ বল।

ইনিংসের শেষ দিকে তিনি কতটা আগ্রাসী ছিলেন তা বোঝা যায় তাঁর শেষ ২৭ বলের পরিসংখ্যানে। নিজের ইনিংসের শেষ ২৭ বলে তিনি তুলেছেন অবিশ্বাস্য ৯০ রান। কলম্বোর মাঠে তখন চার-ছক্কার বৃষ্টি। ইংল্যান্ডের ইনিংসের শেষ ৬৯ রানের মধ্যে ৬৮ রানই এসেছে ব্রুকের ব্যাট থেকে। এটি এমন এক পরিসংখ্যান যা সচরাচর ওয়ানডে ক্রিকেটে দেখা যায় না। বোলারদের জন্য কোনো দয়া মায়া না দেখিয়ে তিনি মাঠের চারদিকে শট খেলেছেন। তাঁর এই ৬৬ বলে অপরাজিত ১৩৬ রানের ইনিংসটি ইংল্যান্ডকে ৩ উইকেটে ৩৫৭ রানের বিশাল সংগ্রহ এনে দিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

অভিজ্ঞ জো রুটের ২০তম সেঞ্চুরি

হ্যারি ব্রুকের এই ঝড়ের মাঝে কিছুটা আড়ালে পড়ে গেলেও, জো রুটের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি এক প্রান্ত আগলে রেখে দলের ভিত্তি মজবুত করেছেন। রুট তাঁর স্বভাবসুলভ ধীরস্থির ও ক্লাসিক্যাল ব্যাটিং স্টাইলে ক্যারিয়ারের ২০তম সেঞ্চুরি তুলে নেন। তবে ইনিংসের শেষভাগে তিনি কার্যত দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অপর প্রান্তে ব্রুকের তাণ্ডব এতটাই প্রবল ছিল যে, রুটকে স্ট্রাইক রোটেট করে ব্রুককে সঙ্গ দেওয়াই ছিল প্রধান কাজ। রুট ও ব্রুকের এই জুটি ইংল্যান্ডকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যায়, যা শ্রীলঙ্কার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। রুটের অভিজ্ঞতা এবং ব্রুকের তারুণ্যের শক্তি—এই দুইয়ের মিশেলে ইংল্যান্ড গড়ে তোলে রানের পাহাড়।

শ্রীলঙ্কার লড়াই এবং পবন রত্নানায়েকের সেঞ্চুরি

৩৫৮ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কা শুরু থেকেই চাপে ছিল। তবে লঙ্কান ব্যাটাররাও সহজে হাল ছাড়েননি। বিশেষ করে পবন রত্নানায়েকের কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়। চাপের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি উপহার দেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসা রান শ্রীলঙ্কাকে লড়াইয়ে রেখেছিল। পবন রত্নানায়েকের সেঞ্চুরির সুবাদে শ্রীলঙ্কা শেষ পর্যন্ত ৩০৪ রান করতে সক্ষম হয়।

কিন্তু বিশাল লক্ষ্যের চাপে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো এবং আসকিং রেট বেড়ে যাওয়ায় জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি স্বাগতিকরা। শেষ পর্যন্ত ৫৩ রানে ম্যাচটি হেরে যায় শ্রীলঙ্কা। ইংল্যান্ডের বোলাররা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন, যা ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে পবন রত্নানায়েকের এই ইনিংস শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে এনেছে।

শেষ ১০ ওভারে সেঞ্চুরি: এক বিরল রেকর্ড

আজকের ম্যাচে হ্যারি ব্রুক যে কীর্তি গড়েছেন, তা ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। তিনি দলীয় ইনিংসের শেষ ১০ ওভারের মধ্যেই নিজের সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, ওয়ানডে ক্রিকেটে কি এর আগে ইনিংসের শেষ ১০ ওভারে কোনো ব্যাটসম্যান ১০০ রান করেছেন? উত্তর হলো—হ্যাঁ, এবং এই তালিকায় বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের নাম রয়েছে।

ওয়ানডে ক্রিকেটে ইনিংসের শেষ ১০ ওভারের মধ্যে কোনো ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি করার এটি নবম ঘটনা। হ্যারি ব্রুক আজ সেই অভিজাত ক্লাবে নিজের নাম লেখালেন। এই তালিকায় এবি ডি ভিলিয়ার্স, রোহিত শর্মা এবং জস বাটলারের মতো কিংবদন্তিরা রয়েছেন। মজার বিষয় হলো, এই তিনজন ব্যাটসম্যানই এই কীর্তি গড়েছেন দুইবার করে।

নিচে এই বিরল রেকর্ডের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

  • এবি ডি ভিলিয়ার্স (দক্ষিণ আফ্রিকা): ২০১৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ ১০ ওভারে তিনি ১২১ রান করেছিলেন। একই বছর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তিনি ১০৯ রানও তুলেছিলেন। শেষ ১০ ওভারে সবচেয়ে বেশি রান করার রেকর্ডটি এখনো তাঁর দখলে।

  • রোহিত শর্মা (ভারত): ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনি শেষ ১০ ওভারে ১১০ রান করেছিলেন। এটিই ছিল ক্রিকেট ইতিহাসে শেষ ১০ ওভারে কোনো ব্যাটসম্যানের প্রথম শতরানের ঘটনা। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তিনি আবারও লঙ্কানদের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েন।

  • গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (অস্ট্রেলিয়া): ২০২৩ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ১০ ওভারে ১০৬ রান করেছিলেন এই অজি অলরাউন্ডার।

  • জস বাটলার (ইংল্যান্ড): ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং ২০১৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিনি শেষ ১০ ওভারে ১০০-এর বেশি রান করেছিলেন।

  • হাইনরিখ ক্লাসেন (দক্ষিণ আফ্রিকা): প্রোটিয়া এই হার্ডহিটার ব্যাটসম্যানও একবার এই কীর্তি গড়েছেন।

হ্যারি ব্রুক আজ এই তালিকার নবম সংযোজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করলেন যে তিনি আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ফিনিশার হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।

ম্যাচ হাইলাইটস ও পরিসংখ্যান টেবিল

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানগুলো:

ক্যাটাগরি বিবরণ
ম্যাচ ইংল্যান্ড বনাম শ্রীলঙ্কা, ৩য় ওয়ানডে
ভেন্যু কলম্বো
ইংল্যান্ড স্কোর ৩৫৭/৩ (৫০ ওভার)
শ্রীলঙ্কা স্কোর ৩০৪ (অল আউট)
ফলাফল ইংল্যান্ড ৫৩ রানে জয়ী
সিরিজ ফলাফল ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হ্যারি ব্রুক (১৩৬* রান)
সেরা পারফর্মার (ইংল্যান্ড) হ্যারি ব্রুক (১৩৬*), জো রুট (সেঞ্চুরি)
সেরা পারফর্মার (শ্রীলঙ্কা) পবন রত্নানায়েক (সেঞ্চুরি)

ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক সিরিজ জয়

২০২৩ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডের ওয়ানডে পারফরম্যান্স নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছিল। বিশেষ করে দেশের বাইরে সিরিজ জিততে না পারাটা ছিল বড় চিন্তার কারণ। কলম্বোয় এই সিরিজ জয় ইংল্যান্ড দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় প্রমাণ করে যে, ইংলিশরা তাদের হারানো ছন্দ ফিরে পাচ্ছে। দলের অধিনায়ক হিসেবে হ্যারি ব্রুক সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা দলের তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।

শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কাকে হারানো কখনোই সহজ কাজ নয়। স্পিন সহায়ক উইকেটে এশীয় কন্ডিশনে মানিয়ে নিয়ে এমন পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে তৃতীয় ম্যাচে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে দলের সিনিয়র এবং জুনিয়র ক্রিকেটারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো।

শেষ কথা

কলম্বোর এই রাতটি নিঃসন্দেহে হ্যারি ব্রুকের রাত হয়ে থাকবে। তাঁর ৬৬ বলের এই টর্নেডো ইনিংসটি ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সাথে জো রুটের ক্লাস এবং পবন রত্নানায়েকের লড়াই ম্যাচটিকে উপভোগ্য করে তুলেছিল। ইংল্যান্ডের এই সিরিজ জয় তাদের আসন্ন টুর্নামেন্টগুলোর জন্য মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে রাখবে। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা হেরে গেলেও পবন রত্নানায়েকের মতো তরুণ প্রতিভার উঠে আসা তাদের জন্য স্বস্তির খবর। ক্রিকেট এমনই, যেখানে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এবং দলীয় প্রচেষ্টার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে, আর আজকের ম্যাচটি ছিল তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Related posts

Leave a Comment